Header Ads

ছোট গল্প কল বিকল

আজকের গল্প: কল-বিকল
লেখক: #মনদীপ_ঘরাই

 সকাল থেকেই কলটা  নষ্ট। কাল রাতেও তো কলকল করে পানি পড়েছে।আর এখন?অস্থির লাগছে সোহানের।
মোটা মোটা বই পড়ে অনার্স মাস্টার্স করে লাভ টা কি? শেষমেষ ওই আন্ডার ম্যাট্রিক মিস্ত্রির কাছেই তো হারতে হয়। ছোট্ট একটা কল সারাতে দেখা গেল ৫০০ টাকা চাবে। তারপর পান খাওয়া লাল দাঁতগুলো বের করে বলবে,
" এর কম হইবো না। পারলে নিজে ঠিক করেন"
তখন কার না মন চাইবে ওকে তুলে আছাড় দিতে? কিন্তু, উপায় কি? আছাড় দেয়ার বদলে চাহিবামাত্র ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য থাকতে হয়।
এমনিতেই চাকরি-বাকরি নেই। টিউশনি করে চলে। তার ওপর হঠাৎ হঠাৎ এসব ভেজাল।
বাড়িওয়ালাকেও বলতে পারে না। তাকে বললেই বলবে,
" নেমে যাও। ব্যাচেলর থাকলে কল তো নষ্ট হবেই"
কেন রে ভাই, ব্যাচেলররা কি কল ভাতে মেখে খায়? নাকি কলের ওপর উঠে নাচে!
খাবার পানির বোতলের তলানিতে থাকা পানি দিয়ে কোনোমতে হাতমুখ ধুয়ে বের হয়ে যায় সোহান। কল নষ্টই থাকুক।বিকল হোক সবকিছু। আজ ওসব ভাবার সময় নেই। আজ হিমির জন্মদিন।
সোহান তেমন স্মার্ট না। দেখতেও কালো। হিমি সুন্দরী। রিক্সায় করে যখন ঘোরে, তখন অধিকাংশ মানুষ নিশ্চয়ই মনে করে,
"এই পোলা এই মাইয়্যা পাইলো কেমনে!!!"
ওসবে কি আসে যায়? হিমির হৃদয়টা জুড়ে শুধু সোহান।
বাসা থেকে বেরিয়েই ফুলের দোকানে যায় সোহান। দোকানটা ফুলের।কিন্তু দামগুলো কাঁটা বেঁধার মতো।
তবুও ৩০০ টাকার লাল গোলাপ কেনে সে। আজ হিমির জন্মদিন।
হিমি আর সোহান বসে আছে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। জন্মদিনের উইশ করা শেষ। এবার চলছে কলের গল্প। কল সারাতে পারে হিমি। অবাক ব্যাপার! ও নাকি ছোটবেলায় কোন এক মিস্ত্রির কাছ থেকে দেখে দেখে শিখেছে। আর কিছুদিন আগে ইউটিউব দেখে পাকাপোক্ত হয়েছে জ্ঞানটা। ভাবে সোহান, তাহলে কি হিমিকে মেসে নিয়ে যাবে কল সারাতে! পরক্ষণেই ভাবে, কি ভাবছে এসব!
কলের গল্পের মাঝেই হিমির মোবাইলে কল আসে একটা।
সূর্যোদয়ের আলোর ছটা হিমির চোখমুখ জুড়ে। কলটা কেটেই আনন্দে জড়িয়ে ধরে সোহানকে।
" আমার চাকরি হয়েছে সোহান। আমি ভাবতেই পারছি না। আমাদের আর কোনো চিন্তা নেই।সেদিনের ওই কল সেন্টারটায় গেলাম না? ওখানেই।কাস্টমার কেয়ার এক্সিকিউটিভ"
হিমির জন্য আনন্দ আর নিজের বেকারত্ব মিলিয়ে একটা দুঃখমিশ্রিত সুখ হয় সোহানের।হিমি ছেড়ে যাবে না তো?
হিমি ছেড়ে যায় না।তবে, ব্যস্ত হয়ে যায়। চাকরির শুরুতে কি কাজের চাপ বেশি থাকে? কিভাবে জানবে সোহান? সে তো চাকরি করে না।
ওদিকে,সেদিন হিমির জন্য গোলাপ কেনায় পানির  কলটা বিকলই রয়ে গেছে। বালতিতে করে পানি এনে চলছে দিন।
এই মুহূর্ত থেকে গল্পটা হিমির। সাফল্যের গল্প নাকি সবার  পছন্দের। আর এই গল্পে হিমিই একমাত্র সফল মানুষ।
সে চাকরি করছে আজ পাঁচদিন হলো। এর মধ্যে সোহানের সাথে  ঝগড়া হয়েছে তিনবার। "সমস্যাটা কি ওর!"
সোহানকে নিয়ে আর ভাবার সময় পায় না। হিমির জীবনটা এখন শুধুই কলকেন্দ্রিক। পানির কল যদিও না,মোবাইল কল।
হিমি কাস্টমারদের কল ধরে না। ওর কাজ কাস্টমারদের কল করে অফার জানানোর। ৩৪৩ থেকে কল করে সে।
কি যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে এই কয়দিনে।
গত পরশু কি হয়েছে শুনুন। হিমি কল দিল। ও প্রান্তে একজন গ্রাম্য মানুষ।
" শুভ সকাল স্যার। কল সেন্টার থেকে হিমি বলছি..."
- কি? কল সেন্টার? ইন্দুরের কল ব্যাচো? তা মোগো গ্রামে পামু ক্যামনে,অ্যা?
- না স্যার। আপনাকে একটি অফার জানাতে ফোন করেছি।
-মুই ইন্দুরের কল ফিরিতে (ফ্রিতে) দেলেও নিমু না। গত মাসে এক বেডি মিষ্টি মিষ্টি কতা কইয়্যা বেচছিল। দুই দিনেই নষ্ট হইসে।
বলেই লাইনটা কেটে দেয়।
আর কাল?
-শুভ সন্ধ্যা। কল সেন্টার থেকে হিমি বলছি।
-কোন ধরনের কল ব্যাচেন? গরম পানি-ঠান্ডা পানি একসাথে বাইর হয় এইরম কল আছে?
-আপনি ভুল করছেন স্যার
-ধুর তোর স্যারের গুষ্টি। আমি ভুল করছি মানে?কল বেচতে আইসো আর জবাব দেবা না!!!
এই কলটা হিমি কেটে দেয়। যদিও সে জানে,কলটা নিজে থেকে কাটার জন্য ভুগতে হতে পারে।
সোহান। মনটা খারাপ হলেই সোহানের কথা মনে পড়ে। আজ দুদিন ধরে কথা নেই। এত ইগোয়িস্ট হলে চলে?
দুদিন থেকে মাস পেরোয়। সম্পর্কটা ভাঙ্গার জোগাড়।হিমি এখনও প্রাণপণে ভালোবাসে সোহানকে। কিন্তু লাভ কি হবে? হিমির ব্যস্ততা,চাকরি কোনোটাই বোঝে না সোহান। এত ছেলেমানুষি হিমিই বা মেনে নেবে কেন??????? ভালোবেসেছে ঠিক আছে। নিজেকে বিক্রি তো করে দেয় নি!
আজ সকালের প্রথম কল:
-শুভ সকাল। কাস্টমার কেয়ার থেকে হিমি বলছি। আপনার কি সময় আছে স্যার, একটা অফারের কথা জানাতাম!
-না নেই। আপনারা এত স্বার্থপর কেন? নিজের দরকারে দিনের মধ্যে পাঁচবার ফোন দেন। আর আমার দরকারের বেলায়!
-সর‍্যি স্যার।বুঝতে পারলাম না।
-আরে আপনারা তো স্বার্থপর প্রেমিকার মতো। নিজের দরকারে ঠিকই ফোন দেন। আর আমরা যখন জরুরী প্রয়োজনে এই ৩৪৩ এ ফোন দেই, তখন লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখেন। আপনার সিরিয়াল ৬১। আরে ভাই, আমার সিরিয়াল ৬১ এর যায়গায় ৬০ হতো, যদি আপনি এই ফালতু অফারের গল্প করতে ফোন না দিয়ে কারও দরকারের ফোনটা ধরতেন।
-সর‍্যি স্যার আমাদের সিস্টেম নেই।
-আমারও অফার শোনার সিস্টেম নেই। লাইনটা কেটে যায়।
মানুষগুলো এমন কেন? মন খারাপ করে দেয় শুধু।
সোহান। মন খারাপ হলেই মনে পড়ে সোহানের কথা।
পাশের ডেস্কে বসা আমাকে হিমি জিজ্ঞেস করে,
"ভাই সোহান এত স্বার্থপর কেন?"
আমি কিছু বলি না। হাসি শুধু।

আজ ছয়মাস হলো হিমির চাকরির। ছয়মাস হয়েছে ব্রেকআপ এরও। অলস দুপুরে মনটা খা খা করছে হিমির। হঠাৎ মনে হলো, সোহানের কন্ঠটা শুনি একটু। যদিও রাগ আছে অনেক, তবু জানা তো যাবে আছেটা কেমন!
৩৪৩ থেকেই কল দিল হিমি।জানে বিপদ হতে পারে চাকরির।তবুও।
- শুভ অপরান্হ।কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছি।
কে বলছে সে নামটা বললো না হিমি।
- বলেন।
একটু থমকে যায় হিমি। কি বলবে? অফারের কথাই বলা শুরু করে।
হিমির কন্ঠ চেনে নি সোহান!!! মনটা চুরমার হয়ে যায় হিমির।  কিন্তু কথা চালিয়ে যায়।
অফারের সব কথা শেষ করে হিমি বলে, স্যার আপনি কি অফারটা নিতে আগ্রহী?
- হ্যাঁ আগ্রহী। যদি আপনি আপনার পার্সোনাল নাম্বারটা দেন। আপনার কন্ঠটা খুব সুন্দর। নিশ্চয়ই আপনি দেখতেও...
মুহূর্তে হিমির চোখে বৃষ্টি নামে। এ সোহানকে সে তো চেনে না! এ কোন সোহান?
- স্যরি স্যার, আমাদের ব্যক্তিগত নাম্বার দেয়ার রুল নেই।
- তাহলে আপনার অফার আপনার কাছেই রাখেন। আমার একটা গার্লফেন্ড ছিলো জানেন। নাম হিমি। ওই বদমাশ মেয়ে কল সেন্টারে চাকরি পেয়ে কি জানি মনে করা শুরু করসে নিজেরে। আমিও প্রতিজ্ঞা করেছি। কল সেন্টারের মেয়ের সাথেই প্রেম করবো। ওরে শিক্ষা দিতে হবে। বাই দ্যা ওয়ে, আপনার নামটা জানি কি বলেছিলেন?
- স্যার, নামটা বলিনি এখনো।
- তাহলে বলেন।
- আমি হিমি। ওই বদমাশ মেয়েটা। ছিঃ সোহান।
লাইনটা কেটে যায়।
অঝরে কাঁদছে হিমি।
পৃথিবীর সব সম্পর্ক পবিত্র হয় না। এই পৃথিবীতে সোহানরাও থাকে। প্রায় ফাঁকা পকেটের তলানির টাকা দিয়ে গোলাপ কিনতে পারে। আবার মনের মাঝে হিমির ছবি সরিয়ে অন্যের ছবি বসানোর স্বপ্নও দেখতে পারে।
সোহান কি ভাবছে? জবাব মেলে না। কারণ, গল্পটা এখনো হিমির।
সোহানের মেসের পানির কলটা আজ আপনা আপনিই ঠিক হয়েছে। কিন্তু, পানি পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়।

"কাঁদছে নাকি বিকল কলটা?"

#মনদীপ_এর_অল্প_গল্প

No comments

Theme images by RedHelga. Powered by Blogger.